1. admin@aalokbarta.com : admin@123 :
  2. wpsvc_dc6021976a8b@wordpress-svc.internal : wpsvc_dc6021976a8b :
জিয়াউর রহমানের শাসনামল: পরিবর্তনের রাজনীতি, উন্নয়নের উদ্যোগ ও বিতর্কের অধ্যায়। - আলোক বার্তা
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০১ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান। ভোলায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মাছের পোনা অবমুক্ত। যা পাইনি, তারাও কি আমাদের জীবনের অংশ নয়? লালবাগে বাসা থেকে আইনজীবীর মরদেহ উদ্ধার রাবির নবীনবরণে গোলাম আযমের বই উপহার, ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনা। জামায়াতের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই জনগণের লংমার্চ: রাশেদ খাঁন। ক্যামেরা ও ব্যাটারিতে বড় চমক, বাজারে এল iPhone 18 Pro সিরিজ। জিয়াউর রহমানের শাসনামল: পরিবর্তনের রাজনীতি, উন্নয়নের উদ্যোগ ও বিতর্কের অধ্যায়। বরিশালে অফিস কক্ষ থেকে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ উদ্ধার। সারাদেশে ৩ মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান শুরু কাল, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

জিয়াউর রহমানের শাসনামল: পরিবর্তনের রাজনীতি, উন্নয়নের উদ্যোগ ও বিতর্কের অধ্যায়।

  • Update Time : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জিয়াউর রহমানের শাসনামল: পরিবর্তনের রাজনীতি, উন্নয়নের উদ্যোগ ও বিতর্কের অধ্যায়

সামরিক শাসনের পথ পেরিয়ে বহুদলীয় রাজনীতি—কী দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান, আর কোথায় ছিল তাঁর শাসনের অসঙ্গতি?

আলোক বার্তা | বিশেষ বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমান এমন এক রাষ্ট্রনায়ক, যাঁকে ঘিরে আজও প্রবল মতবিরোধ রয়েছে। কারও কাছে তিনি বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তক, গ্রাম ও কৃষিভিত্তিক উন্নয়নের প্রবক্তা এবং অর্থনীতিতে নতুন ধারার সূচনাকারী। আবার সমালোচকদের কাছে তিনি সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতায় উঠে আসা একজন শাসক, যার আমলে সামরিক আইন, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং ১৯৭৭ সালের সামরিক বিদ্রোহ-পরবর্তী মৃত্যুদণ্ডের মতো ঘটনা গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।

তাই জিয়াউর রহমানকে বুঝতে হলে আবেগ বা দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে গিয়ে তাঁর সময়ের বাংলাদেশকে দেখতে হবে।

ক্ষমতার কেন্দ্রে জিয়াউর রহমান

১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও একের পর এক অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ চরম অস্থিরতার মধ্যে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান ধীরে ধীরে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। ১৯৭৬ সালের নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

অর্থাৎ তাঁর শাসনের সূচনা হয় একটি স্বাভাবিক নির্বাচনী গণতান্ত্রিক ধারার মধ্য দিয়ে নয়; বরং সামরিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পটভূমিতে।

তবে এখানেই তাঁর শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য দেখা যায়—সামরিক কাঠামোর ভেতর থেকে ক্ষমতায় উঠে এসে তিনি পরবর্তীতে নির্বাচনী ও বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে এগিয়ে যান।


বহুদলীয় রাজনীতির প্রত্যাবর্তন

জিয়াউর রহমানের শাসনামলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর তাঁর সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর থাকা বিধিনিষেধ শিথিল করে। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসন পায়।

এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন। কারণ ১৯৭৫ সালের আগে ও পরে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা একাধিকবার গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল।

তবে সমালোচনার জায়গাটিও এখানেই—বহুদলীয় রাজনীতির পুনরুদ্ধার হলেও জিয়ার ক্ষমতার প্রথম পর্যায় ছিল সামরিক আইননির্ভর। ফলে তাঁর গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে সম্পূর্ণ ও নিখুঁত গণতান্ত্রিক যাত্রা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।


১৯ দফা: উন্নয়নের নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য

জিয়াউর রহমানের শাসনামলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল ছিল তাঁর ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি

এই কর্মসূচিতে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন, গ্রামীণ উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা, জনসম্পৃক্ততা, শিল্পায়ন, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবার পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

বিশেষ করে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তৎকালীন বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। ফলে গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনার চিন্তা ছিল সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

গ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়ন

জিয়ার উন্নয়ন দর্শনে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—শুধু রাজধানী বা শহর নয়, গ্রামকেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল অংশীদার করা।

কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন তাঁর নীতিতে গুরুত্ব পায়।


অর্থনীতিতে পরিবর্তনের চেষ্টা

জিয়াউর রহমানের সময় অর্থনীতিতে রাষ্ট্রনির্ভর কাঠামোর পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ ও বিনিয়োগকে উৎসাহ দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

উৎপাদন বাড়ানো, শিল্পের বিকাশ এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার পেছনে এই সময়ের নীতিগত পরিবর্তনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখা হয়।

তবে অর্থনৈতিক সাফল্যের মূল্যায়নে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনকে শুধুমাত্র একটি সরকারের নীতির ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসের জন্য অতিসরলীকরণ হবে।


তাহলে অসঙ্গতিগুলো কোথায়?

জিয়াউর রহমানের শাসনের ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি কিছু ঘটনা ও সিদ্ধান্ত আজও গভীর বিতর্কের বিষয়।

সামরিক আইন ও ক্ষমতায় আসার প্রশ্ন

সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি হলো—একজন সামরিক কর্মকর্তা কীভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ক্ষমতায় এলেন?

জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত। ফলে তাঁর শাসনের গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক থেকেই যায়।

পরবর্তীতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তাঁর ক্ষমতায় আসার প্রাথমিক প্রক্রিয়াটি ছিল সামরিক-রাজনৈতিক অস্থিরতার ফল।


১৯৭৭ সালের বিদ্রোহ ও মৃত্যুদণ্ড

জিয়াউর রহমানের শাসনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো ১৯৭৭ সালের সামরিক বিদ্রোহের পর ব্যাপক ধরপাকড় ও মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা।

এই ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা, বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তবে এটি নিয়ে সন্দেহ নেই যে ঘটনাটি তাঁর শাসনের অন্যতম গভীর বিতর্কিত অধ্যায়।

প্রশ্ন উঠেছে—অভিযুক্তদের বিচার কতটা স্বচ্ছ ছিল? সামরিক আদালতের প্রক্রিয়া কতটা ন্যায়সংগত ছিল? এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে কতটা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই জিয়ার শাসনের মানবাধিকার মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।


সংবিধান ও রাষ্ট্রের আদর্শে পরিবর্তন

১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৫-১৯৭৯ সময়ের সামরিক আইনভিত্তিক বিভিন্ন ঘোষণা ও পদক্ষেপকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়। একই সময়ে সংবিধানের রাষ্ট্রপরিচয়ের ভাষ্যেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। এ নিয়ে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে।

এখানেই জিয়ার শাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য দেখা যায়।

একদিকে তিনি বহুদলীয় রাজনীতির পথ খুলেছিলেন; অন্যদিকে তাঁর আমলে সংবিধান ও রাষ্ট্রের আদর্শগত কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়।


জিয়াউর রহমান: সংস্কারক নাকি সামরিক শাসক?

সম্ভবত এই প্রশ্নের একক উত্তর নেই।

তাঁকে শুধু ‘সামরিক শাসক’ বললে তাঁর বহুদলীয় রাজনীতি, ১৯ দফা, গ্রামীণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তনের দিকগুলো আড়ালে পড়ে।

আবার তাঁকে শুধু ‘গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা’ বললেও তাঁর ক্ষমতায় আসার সামরিক প্রেক্ষাপট, সামরিক আইন এবং ১৯৭৭ সালের দমনমূলক পদক্ষেপের বিতর্ক উপেক্ষিত হয়।

ইতিহাসের বিচারে তাঁর শাসন ছিল এই দুই বাস্তবতার সংমিশ্রণ।


জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সম্ভবত তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি।

১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দলটি ডান, বাম ও মধ্যপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষকে একত্র করার চেষ্টা করেছিল।

‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই রাজনৈতিক দর্শন পরবর্তী কয়েক দশকে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান ধারায় পরিণত হয়।

ফলে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক প্রভাব তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়নি; বরং তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ধারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজও গুরুত্বপূর্ণ।


শেষ কথা: ইতিহাসের কাঠগড়ায় জিয়া

জিয়াউর রহমানের শাসনামল ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল অধ্যায়।

ভালো দিকের তালিকায় রয়েছে—

  • বহুদলীয় রাজনীতির পুনরুজ্জীবন
  • নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন
  • কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্ব
  • আত্মনির্ভরতার ওপর জোর
  • অর্থনীতিতে বেসরকারি উদ্যোগ উৎসাহিত করা
  • ১৯ দফার মাধ্যমে উন্নয়নকে রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে আনা

অন্যদিকে সমালোচনার প্রধান ক্ষেত্রগুলো হলো—

  • সামরিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসা
  • সামরিক আইননির্ভর শাসনের উত্তরাধিকার
  • ১৯৭৭ সালের বিদ্রোহ-পরবর্তী মৃত্যুদণ্ড ও বিচারপ্রক্রিয়া
  • সংবিধানের আদর্শগত পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক
  • গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সামরিক শক্তির মধ্যকার টানাপোড়েন

সুতরাং জিয়াউর রহমানকে মূল্যায়নের সবচেয়ে ন্যায়সংগত পথ হলো তাঁকে না দেবতা বানানো, না খলনায়ক বানানো।

বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি ছিলেন এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক, যিনি এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর কিছু পদক্ষেপ বাংলাদেশকে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পথে এগিয়ে দিয়েছিল, আবার কিছু সিদ্ধান্ত সৃষ্টি করেছিল দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক।

ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠে—জিয়াউর রহমান একই সঙ্গে পরিবর্তনের প্রতীক এবং বিতর্কেরও প্রতীক।


আলোক বার্তা | সম্পাদকীয় নোট

এই বিশ্লেষণে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কোনো দলীয় অবস্থান থেকে নয়, বরং তাঁর শাসনামলের ইতিবাচক উদ্যোগ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্ত—তিনটি দিক মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ ইতিহাসকে বুঝতে হলে প্রশংসার পাশাপাশি প্রশ্ন তোলার সাহসও থাকতে হয়।

অনুগ্রহ করে এই পোস্টটি শেয়ার করুন।

এই বিভাগের আরও খবর