
ছবি: অনলাইন থেকে নেওয়া
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দলটি ভোট বর্জন করেছিল মাত্র দুবার, কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধন স্থগিত থাকায় ভোট করার সুযোগই পায়নি দলটি। ফলে পোস্টাল ব্যালটেও নেই ঐতিহ্যবাহী নৌকা মার্কা।
আওয়ামী লীগ আন্দোলনের মধ্যে দুটি নির্বাচন বর্জন করেছিল:
সব মিলিয়ে ১৩টি নির্বাচনের মধ্যে তিনটির ব্যালট পেপারে থাকল না নৌকা প্রতীক। তবে এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন—এটি দলের ইচ্ছাধীন সিদ্ধান্ত নয়, বরং নিবন্ধন স্থগিত থাকার কারণে বাধ্যতামূলক অনুপস্থিতি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর পরপরই রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের নিবন্ধনও স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন।
অভ্যুত্থান দমাতে ‘গুম, খুন, পুড়িয়ে মানুষ হত্যা, গণহত্যা, বেআইনি আটক, অমানবিক নির্যাতন, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, সন্ত্রাসী কার্য ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার কথা জানায় সরকার। ফলে ছয় মেয়াদে দুই যুগের বেশি সময় সরকারে থাকা দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
৭ মার্চ ১৯৭৩: স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এটি ছিল দলটির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯: দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে আব্দুল মালেক উকিলের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করে বিরোধী দলের আসনে বসে। বিএনপি পায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
৭ মে ১৯৮৬: তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করে বিরোধী দলের আসন লাভ করে। তবে ভোটে অংশ নেওয়ার প্রশ্নে ১৫ দলীয় ঐক্যজোটে ভাঙন দেখা দেয়।
৩ মার্চ ১৯৮৮: চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ বেশিরভাগ দল ভোট বর্জন করে। এটি ছিল দলের প্রথম ভোট বর্জন।
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১: অস্থায়ী সরকারের অধীনে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট অংশগ্রহণ করে। বিএনপির জয়ের পর সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ তোলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে আন্দোলনরত আওয়ামী লীগ ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন বর্জন করে। এই আন্দোলন পরবর্তীতে সফল হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়।
১২ জুন ১৯৯৬: সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং পুনরায় সরকার গঠন করে।
১ অক্টোবর ২০০১: মেয়াদ পূর্ণ করার পর অষ্টম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটে এবং বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
২৯ ডিসেম্বর ২০০৮: নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। এটি ছিল দলের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা।
৫ জানুয়ারি ২০১৪: বিএনপি ও কয়েকটি বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়া অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। এই নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
৩০ ডিসেম্বর ২০১৮: নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৫৮টি আসনে জয়লাভ করে।
৭ জানুয়ারি ২০২৪: দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২২টি আসনে জয় পায়। তবে এই নির্বাচনে বিএনপিসহ ১৬টি দল ভোট বর্জন করে।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: নিবন্ধন স্থগিত থাকায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট করার সুযোগই নেই আওয়ামী লীগের। এটি দলটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এমন ঘটনা যেখানে তারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অংশগ্রহণ করতে পারছে না।
২০০৮ সালে দল নিবন্ধন প্রথা চালুর পর মোট ৬৩টি দল নিবন্ধন পেয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দলের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে এবং একটি দলের নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে (আওয়ামী লীগ)।
বর্তমানে ৬০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫০টি দল ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এতে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলে মোট ২০০৯ জন প্রার্থী রয়েছেন।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইতিহাস বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার এক জীবন্ত দলিল। স্বাধীনতার পর থেকে এই দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। ছয় মেয়াদে দুই যুগের বেশি সময় সরকারে থাকা এই দলটির বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
নিবন্ধন স্থগিত থাকা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকায় আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত। তবে দলটির দীর্ঘ ইতিহাস এবং জনসমর্থনের ভিত্তি বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দলের প্রভাব সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায়নি। আগামীতে কী ঘটবে, তা নির্ভর করবে চলমান বিচার প্রক্রিয়া এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর।
এই নিবন্ধটিতে আওয়ামী লীগের ১৯৭৩ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ নির্বাচনী ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।