টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন—বাংলাদেশের রাজনীতির কয়েক দশকের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পথচলা
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার ৭৯তম জন্মদিন আজ। ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম পরিচিত ও আলোচিত রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ থেকে শুরু করে একাধিক মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন—তাঁর রাজনৈতিক জীবন দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার শুরু ছাত্রজীবনেই। ১৯৬০-এর দশকে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন বলে বাসসের জীবনীভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার সময় শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন। ফলে তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান। এরপর কয়েক বছর তাঁকে দেশের বাইরে অবস্থান করতে হয়।
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ওই বছরের ১৭ মে তিনি দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি দলের নেতৃত্ব দেন।
১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে তিনি বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করলে শেখ হাসিনা আবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। এরপর পরবর্তী কয়েকটি নির্বাচনের পরও তিনি সরকারপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে বাংলাদেশের অবকাঠামো, অর্থনীতি, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক খাতের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তাঁর সরকারের সময় পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বিভিন্ন বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এসব কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সরকারের উন্নয়নমূলক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্নমত রয়েছে। তাঁর সমর্থকেরা দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে, তাঁর সরকারের সময় রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা এসেছে। এসব অভিযোগের অনেকগুলো নিয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
ফলে তাঁর দীর্ঘ শাসনামলকে ঘিরে মূল্যায়ন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনও বিতর্কিত ও বহুমাত্রিক।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন পরবর্তীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং দেশ ত্যাগ করেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এবারের জন্মদিন শেখ হাসিনার জন্য একটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসেছে। একসময় টানা প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করা এই রাজনৈতিক নেতা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। একই সঙ্গে তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
তবে তাঁর কয়েক দশকের রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় নেতৃত্ব, বিরোধী রাজনীতি থেকে সরকার পরিচালনা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন—প্রতিটি পর্যায়েই শেখ হাসিনাকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
৭৯তম জন্মদিনে তাই ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তাঁর ভূমিকা এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর সময়ের নানা ঘটনা।