কারাগারে বন্দিদের মৃত্যু: ছয় মাসে ৬১, ঢাকায় সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনেই ১০ জন
চিকিৎসাসেবা, জনবল ও দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন; কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, অধিকাংশের মৃত্যু হয়েছে অসুস্থতার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায়
আলোক বার্তা । বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে বন্দিদের মৃত্যুর ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে। তাদের মধ্যে ৩৭ জন ছিলেন বিচারাধীন মামলার আসামি এবং ২৪ জন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক চিত্র আরও উদ্বেগের। ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও কাশিমপুর কারাগারের বন্দিদের মধ্যে চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনেই অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অথবা হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।
সর্বশেষ গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দুই বন্দি—ইফতেখার মাহমুদ (৩৬) ও তোফাজ্জল হোসাইন পলাশ (৩৮)—ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। কারা সূত্রের বরাতে জানা যায়, ইফতেখার ১৯ সেপ্টেম্বর কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে ভর্তি হন। অন্যদিকে তোফাজ্জল হোসাইন পলাশ কারাগারে অসুস্থ ও অচেতন হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর আগে সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন সময়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের আরও কয়েকজন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তিন বন্দির মৃত্যু এবং পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকজনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ফরিদপুর জেলা কারাগারেও ২২ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক হাজতির মৃত্যু হয়।
কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক বন্দি আগে থেকেই বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগে কারাগারে আসেন। গুরুতর অসুস্থ হলে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং সাম্প্রতিক বেশির ভাগ মৃত্যুই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঘটেছে। তবে কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
এদিকে বন্দিদের চিকিৎসাসেবা নিয়ে মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। তাদের বক্তব্য, কারাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দি থাকা, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সক্ষমতার ঘাটতি বন্দিদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তবে প্রতিটি মৃত্যুর কারণ এক নয়। প্রকাশিত তথ্যগুলোতে হৃদ্রোগ, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, কিডনি ও ডায়াবেটিসজনিত জটিলতাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কথা এসেছে। ফলে কারাগারে মৃত্যুর সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণে পৃথক পৃথক ঘটনার ময়নাতদন্ত, চিকিৎসা নথি ও তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
কারাগারে থাকা ব্যক্তি সাজাপ্রাপ্ত হোন বা বিচারাধীন—রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকার কারণে তার জীবন ও চিকিৎসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। তাই বন্দিদের মৃত্যুর কারণ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং জরুরি রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার আওতায় আনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক মৃত্যুগুলোর ধারাবাহিকতা তাই শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; কারাগারের চিকিৎসাব্যবস্থা, বন্দিদের স্বাস্থ্য অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।