ঢাকা, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ওই প্রদর্শনের প্রতিবাদে সংগ্রহশালায় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত গোলাম আযমকে জুতাপেটার একটি ঐতিহাসিক ছবি সাঁটিয়েছে ছাত্র ফেডারেশন।
সোমবার বিকেল ৩টার দিকে ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী এ ছবি সাঁটান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ডাকসুর ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন তারা মেনে নেবে না।
ছাত্র ফেডারেশনের এই কর্মসূচিকে মূলত ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী ও ঐতিহাসিক পাল্টা বক্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ছাত্র ফেডারেশনের নেতা অর্ক বড়ুয়া বলেন, “ডাকসু কারো বাপের না। ইতিহাসকে একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন কেউ মেনে নেবে না।” তার বক্তব্য অনুযায়ী, গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঐতিহাসিক ঘটনাটিকেও ইতিহাসের অংশ হিসেবে সামনে আনা হয়েছে।
ডাকসু সংগ্রহশালায় ১৯৪৮ সালের জিন্নাহর একটি ছবি প্রদর্শনকে ঘিরে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ছাত্রদলও ছবিটি প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং তা সরানোর দাবি তুলেছে।
এর বাইরে এক শিক্ষার্থী সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ করেছেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ডাকসুর সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, বিধি ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব ঘটনায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
ডাকসু সংগ্রহশালার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু একটি ছবি প্রদর্শন বা সরানোর বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক ইতিহাসের ব্যাখ্যার প্রশ্ন।
একদিকে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে কেউ ঐতিহাসিক নথি বা উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে ১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষার প্রশ্নে জিন্নাহর অবস্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে অনেকে মনে করছেন, তাঁর ছবি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবি সাঁটানোর মাধ্যমে ছাত্র ফেডারেশন বোঝাতে চেয়েছে—১৯৭১-এর ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা এবং পরবর্তী সময়ে জনতার প্রতিক্রিয়াও একইভাবে ইতিহাসের আলোচনায় থাকা উচিত।
তবে ইতিহাসকে সামনে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কোনো পক্ষের পছন্দ বা অপছন্দের ভিত্তিতে ইতিহাস নির্বাচন না করে, তথ্য-প্রমাণ ও প্রেক্ষাপটসহ পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস তুলে ধরা হচ্ছে কি না।
ডাকসুর মতো ঐতিহাসিক একটি প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহশালা তাই কেবল ছবি প্রদর্শনের স্থান নয়; এটি হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসের বহুমাত্রিক পাঠের জায়গা। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।