মেয়ের বিয়ের জন্যে টাকা নিয়ে ফিরছিলেন ইসমাইল হোসেন। শারমীন, একমাত্র মেয়ে। তাই নিজের শেষ সম্বল গ্রামের জমিটুকু সাড়ে দশলাখ টাকায় বিক্রি করে দেন। এরপর গাজীপুরে ফিরছিলেন পরিবারের কাছে।
গল্পটা এ পর্যন্ত খুব সুন্দর। সব ঠিকঠাক।
বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাওয়া টিনেজ পেরোনো মেয়েটা হয়তো আনন্দের আতিশয্য অপেক্ষা করছিলেন বাবার জন্যে।
কিন্তু বাবা ফেরেনি। বাবা আর ফিরবে না। তার লাশ পড়ে রয়েছিল ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে। মুখে টেপ মারা।
ইসমাইল হোসেনের গ্রামের বাড়ি জামালপুর সদর উপজেলায়। গাজীপুরে ডেল্টা স্পিনিং মিলে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করতেন। ৯ মাস আগে অসুস্থতার কারণে চাকরি ছেড়ে দেন। চাকরি ছাড়ার পরেও গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকায় স্ত্রী, দুই সন্তান ও ছেলের বউকে নিয়ে বসবাস করতেন।
মাস চারেক আগে গ্রামে থাকার উদ্দেশ্যে এলাকায় যান। সেখানে গিয়ে নিজের এগার শতাংশ জমি বিক্রি করে দেন সাড়ে দশলাখ টাকায়। এরপর ঋণ শোধ করেন দুই লাখ টাকা। মেয়ের বিয়ের জন্যে রাখেন পাঁচ লাখ। বাকি টাকা দিয়ে গ্রামেই ছোট একটা ঘর দেন। মেয়েকে একটা ভালো জায়গায় পাত্রস্থ করে হয়তো গ্রামে স্থায়ী হওয়ারই বাসনা ছিল ইসমাইলের।
মেয়ের বিয়ের সেই টাকা নিয়েই ফিরছিলেন গাজীপুরে। পথে কোথাও থেকে তিনি নিখোঁজ হন।
মেয়েটার অপেক্ষা আর কাটলনা। বাবাতো আর কোনদিনই ফিরবে না।
ইসমাইলের ছেলে হাসান লাশ শনাক্ত করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তিনি বলেছেন, তার বাবার কাছে জমি বিক্রির ৫ লাখ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিল; যেগুলো ‘পাওয়া যায়নি’। শুক্রবার সকালে তার বাবার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তখন মরদেহের মুখে টেপ মারা ছিল, পরনে ছিল অটোরিকশা চালকদের ইউনিফর্মের মত নীল রঙের শার্ট আর লুঙ্গি।
হাসান জানান, “বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৩ টার দিকে গাজীপুরে যাওয়ার উদ্দেশে জামালপুর থেকে রওনা হয়েছিলেন তিনি। সকালে এসে পৌঁছানোর কথা।
ঘরজুড়ে তখন শুভপরিণয়ের আবাহন, কনের সাজে সাজতে যাওয়া মেয়েটির চোখে স্বপন আর চঞ্চল অপেক্ষা। বাবা ফিরবেন, হাতে থাকবে তার জীবনের শেষ সম্বল-মেয়ের সুখের রাজতিলক। কিন্তু পথিমধ্যে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল এক পথশ্রান্ত পিতাকে। রক্তমাংসের হাসিমুখের বদলে ফিরে এলো মুখে টেপ আঁটা নিস্পদ এক লাশ।
মেয়েটির অধীর অপেক্ষার প্রহর হঠাৎ জমে বরফ হয়ে গেল; যে বাবা আজীবন আগলে রাখলেন, তিনি আর কোনোদিনই ঘরে ফিরবেন না।
বাবা আর ফিরবেন না।
বিচার চাওয়াতো বিলাসিতা। রাস্ট্র অন্তত অভিভাবক হয়ে মেয়ের বিয়ের দায়িত্বটা পালন করুক।